জাতির আত্মবিশ্বাস

একটা দেশ বা জাতি যখন দিনের পর দিন উপলব্ধি করে যে তারা অন্যদের থেকে নিচু বা দূর্বল তখন সেই উপলব্ধিটাকে দূর করা অনেক কঠিন। আর সেটার প্রভাব পড়তে থাকে তাদের কাজে-কর্মে এবং চিন্তায়-বাস্তবে। তবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় একটা জাতির আত্মবিশ্বাস যেমন কমতে পারে তেমনি বাড়তেও পারে। আমাদের জাতিই মনোবলের উত্থান পতনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং যাচ্ছে।


দীর্ঘদিন অন্য জাতি দ্বারা শাসিত হয়ে আমাদের মনে একটা স্থায়ী ধারণা সৃষ্টি হয়ে গেছে যে আমরা অন্য জাতির থেকে পেছনে। অর্থাৎ মার্কিন, ইউরোপিয়ান, আরবীয়রা আমাদের থেকে একটু উঁচু স্তরের। আমাদের প্রতি তাদের ব্যবহারও সেই রকম। এইসব কারণে, মনের কোন এক গহীন কোণে হলেও আমরা তাদের সমীহ করে চলি।

কোন স্বপ্নেও আমাদের মনে হয় না, আমরা পৃথীবীর সেরা জাতিগুলোর একটা। অথাবা, আমরা অন্যদের থেকে কোন অংশে কম নই। এক্ষেত্রে বাস্তবতাও আমাদের পক্ষে নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালি জাতির অবদান খুব কম। অর্থাৎ পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি আজ যে পর্যায়ে এসেছে তাতে আমাদের জাতির অবদান নগণ্য।

কিন্তু পশ্চিমা জাতিগুলোর অবস্থা আমাদের ঠিক বিপরীত। তারা মনে করে এই পৃথিবীটা তাদেরই। তারাই পৃথিবীর অভিভাবক। তাই তারা ইচ্ছা করলেই অন্য দেশ বা জাতির ভবিষ্যত নিয়ন্ত্রণ করে ফেলতে পারে। বাস্তবে তারা সেটা করেও। বর্তমান শান্তিপূর্ণ বিশ্বে অন্য দেশকে আক্রমণ করে বশে আনার নজির বিরল নয়।

ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও যেসব জাতি অন্যদের শাসন করেছে তারা বেশ উন্নাসিক। অন্যদিকে শাসিত জাতিরা বিনয়ী। তারা চোখ নামিয়ে কথা বলে।

বর্তমান সময়ে আমরা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অবস্থাগুলোর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণ যখন দেখছে অন্য জাতির লোকজনও যা করতে পারে তারাও তাই করতে পারে তখন তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তারা নিজেদের উপর বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারাও কোন অংশে কম নয়। এটার একটা বড় উদাহরণ ক্রিকেট খেলা।

ক্রিকেটে আগে বাংলাদেশ সন্তোষজনকভাবে হারলেই খুশি ছিল। কিন্তু এখন একটা ম্যাচ জিতেও তারা পরিতৃপ্ত হয়না। তারা এখন বিশ্বসেরা হতে চায়। আর কেউ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে সে অন্যের থেকে কোন অংশেই কম নয় তাহলে তাকে আটকানো কঠিন। ফলে পারফরমেন্স আর আত্মবিশ্বাস একে অপরকে ক্রমান্বয়ে বাড়াতে থাকে। একটি আর একটিকে বাড়ায়, তখন অন্যটি প্রথমটিকে আরও বেশি বাড়ায়। এভাবে পারফরমেন্স বাড়তেই থাকে। এই প্রভাব খেলোয়াড়দের উপর যেমন পরে সাথে সাথে পুরো জাতির সবার উপরও পরে। অর্থাৎ অন্যরাও বিশ্বাস করতে থাকে তার দেশের ছেলেরাই যদি এমন কাজ করতে পারে তাহলে সেও নিশ্চয়ই অনেক কিছু করতে পারবে।

সবচেয়ে মজার ব্যপার হল কোন জাতির আত্মবিশ্বাস বাড়লে সেটা সবকিছুর উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। যেমন ক্রিকেট দলের খেলায় উৎসাহিত হয়ে, আর একজন হয়ত বিদেশিদের সাথে ব্যবসা করতে গিয়ে তাদের কাছে আর মাথা নিচু করবে না।

অর্থাৎ জাতির আত্মবিশ্বাস বা মাইন্ডসেটের ব্যপারটা অনেক গতিশীল। একটা জাতি চিরদিন নিজেদের সেরা ভাববে এমন কোন কথা নেই। আর একটা জাতি আজীবন হীনমন্যতায় ভুগবে এমনও কোন কথা নেই। তাদের কাজের মাধ্যমে তারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আমাদের দেশ জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটু একটু করে এগিয়ে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের একটা আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি করেছে। সেটা ক্রিকেট হোক, কিংবা গার্মেন্টস। এই অর্জনগুলো থেকে পাওয়া সাহসকে কাজে লাগিয়ে আমারা আরও বহু ক্ষেত্রে নিজেদের উন্নত জাতির পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারব। সেটার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই হয়ত আমরা সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি চলে যাব।

ভবিষ্যতে একসময় বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ হয়ত মনে করবে তারা পৃথিবীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা পৃথিবীর অভিভাবক। সবার ভাল নিয়ে ভাবার দায়িত্বটা তাদেরই। তখন এই ভাবনাটাই আমাদের জাতিকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাবে। এই ভাবনা আর আত্মবিশ্বাসটা পেতে হলে অনেক অনেক দূর পথ যেতে হবে আমাদের।

মঞ্জিলুর রহমান
কিবল কলেজ, অক্সফোর্ড

লেখাটি শেয়ার করুন

Share on FacebookTweet on TwitterPlus on Google+


ইমোটিকনইমোটিকন