বিসিএস অভিজ্ঞতাঃ লিখিত পরীক্ষা

৩৫ তম বিসিএসের রেজাল্ট হওয়ার পর অনেকে আমাকে ফেসবুকে মেসেজ করছে ভাই আপনি কিভাবে এডমিন ক্যাডারে দ্বিতীয় হলেন। কোন কোন বই পড়েছেন। কতক্ষণ পড়াশুনা করতেন দৈনিক। একটা কমন প্রশ্ন ছিল, বিসিএস পরীক্ষার আগে আপনি প্রতিদিন কত ঘন্টা পড়াশুনা করতেন। আমি যখন বলি, আমি বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাসটাও ঠিকমত জানতাম না, নিয়মিত পড়া তো দূরের কথা, পরীক্ষার আগের রাত বাদে বিসিএসের কোন গাইডও দেখিনি। তখন আমার কথা কেউই বিশ্বাস করতে চায়না।
 
বিশ্বাস না হলেও কথাটা সত্যি। বিসিএস লিখিত পরীক্ষা দিয়ে এসেই নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা পোস্ট লিখেছিলাম এই গ্রুপে। হ্যাঁ অন্যদের মত আমারও সন্দেহ ছিল লিখিত পরীক্ষায় পাশ করব কিনা। শেষ পর্যন্ত ক্যাডারও যে পেয়ে যাব এটা আমার নিজেরই ভাবনার অতীত ছিল।

আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি, প্রিলি ও লিখিত দু’টো পরীক্ষাতেই আমার মনে হয়েছে বিসিএস কমনসেন্সের পরীক্ষা। আপনি স্কুল পর্যন্ত যা কিছু পড়েছেন আর দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু শুনছেন আর দেখছেন তা থেকেই প্রশ্ন আসে বিসিএসে। যেমন- বাংলা, ইংরেজী আর অংকের কথাই ধরেন। বাংলা ব্যাকরণ থেকে শুরু করে, সারাংশ, ভাব সম্প্রসারণ ও রচনা সবই স্কুলের জ্ঞান থেকে লিখে ফেলা সম্ভব।

৩৫ তম লিখিত পরীক্ষার সারাংশটা মজার ছিল। রবীন্দ্রনাথের লেখা একটা কবিতার কয়েকটা লাইন তুলে দিয়ে তার সারাংশ লিখতে বলেছিল,

“আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',
সুন্দর হল সে।”

কবিতাটা আমার অনেক প্রিয়।

কথা হচ্ছে বিসিএসের প্রস্তুতির জন্য তাই স্কুলে যা পড়েছেন তা মনে থাকলেই বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর করতে পারার কথা। অনেকের সেগুলো মনে না থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে, সেটা একটু রিভাইজ করে নিলেই হয়ে যাবে। নতুন করে কিছু পড়ার চেয়ে আগের জানা জিনিস দেখলেই সহজে শেখা যায়। বাংলার ক্ষেত্রে এসএসসিতে মুনীর চৌধুরী লিখিত যে ব্যাকরণ পড়ানো হয় সেটা বেশ কাজের। বাংলায় এর থেকে ভাল ব্যাকরণ কমই আছে। তবে এটি মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণ। পূর্ণাংগ ব্যাকরণ লেখার মত জ্ঞান অনেকের থাকলেও কেউই বাংলা ভাষাটির জন্য একটি ব্যাকরণ লিখে যাননি। যেকারণে সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষার কোন ব্যাকরণ এখন পর্যন্ত নেই।

আমার নিজের বাংলা পরীক্ষার আমি একটা বড় ভুল করেছিলাম অবশ্য। সম্প্রতিক প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গ্রন্থের সমালোচনা লিখতে বলা হয়েছিল। আমি জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প উপন্যাসের কথা লিখেছিলাম যদিও সেটা সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত নয়। এছাড়া আর কোন বড় ভুল করিনি। তবে সাহিত্য ও ব্যাকরণের সে ছোট-প্রশ্নগুলো থাকে সেগুলো বেশিরভাগই একদম সঠিক উত্তর করতে পারিনি।

ইংরেজীতে এসএসসি ও এইচএসসি এর প্যাটার্নেই কম্প্রিহেনশন কোয়েশ্চেন থেকে শুরু করে কমপজিশন, ফিল ইন দ্যা গ্যাপ, সেন্টেন্স কমপ্লিশন সবই থাকে। ইংরেজী গ্রামার একটু ভালভাবে জানা থাকলে আর নিয়মিত একটু একটু করে ইংরেজী পড়ার অভ্যাস করলেই ইংরেজীতে ভাল না করার কোন কারণ নেই। প্রতিদিন একটা ইংরেজী পত্রিকা বা পছন্দের গল্পের বই ইংরেজী পড়লে কাজ হতে পারে। ইংরেজী চর্চা করার কিছু একস্ট্রা বেনিফিট বা সুবিধা আছে। বাংলাদেশের যেকোন চাকরিতেই ইংরেজী জানাকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়। বিদেশে যাওয়ার জন্যও ইংরেজী কাজে লাগে। তাই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজী চর্চা করলে ক্ষতির কিছু নেই।

অংকে ঐকিক নিয়ম থেকে শুরু করে, জ্যামিতি, বিন্যাস সমাবেশ ইত্যাদি যা কিছুই থাকে সবই স্কুল কলেজে পড়ানো হয়েছে। কাজেই এখানেও নতুন করে কিছু শিখতে হবে না।

বিজ্ঞানও ব্যতিক্রম নয়। কিছু কিছু প্রশ্ন অবশ্য স্কুলের চেয়ে একটু হায়ার লেভেলের থাকে। তবে কলেজ লেভেলে সেগুলো পড়ানো হয়। আর স্কুলের সামাজিক বিজ্ঞান বই থেকেই বাংলাদেশ বিষয়াবলীর মোটামোটি সব প্রশ্নের উত্তর করা যায়। যেমন – চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কি? ছয় দফার দফাগুলো কি কি? তবে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ ধারা জানা থাকলে পরীক্ষায় অনেক ভাল করা সম্ভব।

একদম নতুন বলতে শুধু আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী। এমপিথ্রি ডাইজেস্ট পড়ে এতে খুব ভালো না করলেও অন্তত পাশ করা সম্ভব। এই বিষয়ে যা জেনেছি তা দিয়ে এখন নিয়মিত আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতে পারি। ইস্ট-ওয়েস্টের সম্পর্ক, ইউএসসে-রাশিয়া বৈরীতা, ব্যালেন্স অব পাওয়ার এই বিষয়গুলো জানা থাকায় এখন বিদেশী বন্ধুদের নিয়মিত বুঝাতে সমর্থ হই কেন তাদের ওয়েস্টের জ্ঞান আমাদের ইস্টের লোকদের উপর ঝেরে লাভ নেই।

তাই যারাই সামনে লিখিত পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন বেশি টেনশান না করে যা পারেন তা থেকেই লিখে দিয়ে আসবেন। যথাসম্ভব শুদ্ধ ভাষায় যুক্তি দিয়ে সবকিছু লিখবেন আর গণিতে ও বিজ্ঞানে টু-দি-পয়েন্ট লিখবেন। তাহলেই কাজ হয়ে যাবে। আপনার কাজ নিজের ১০০%টাই দেওয়া, ফলাফল কি হবে সেটা পরের কথা।

মঞ্জিলুর রহমান
কিবল কলেজ, অক্সফোর্ড

লেখাটি শেয়ার করুন

Share on FacebookTweet on TwitterPlus on Google+


ইমোটিকনইমোটিকন